August 31, 2026, 8:20 pm

পেঁয়াজ জ্বালিয়ে দিচ্ছেন ভারতের কৃষকরা

পেঁয়াজ জ্বালিয়ে দিচ্ছেন ভারতের কৃষকরা

ভারতের মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন সত্ত্বেও বিপাকে রয়েছেন কৃষকরা। বাড়তি ফলনের কারণে এ বছর পেঁয়াজের দাম মুখ থুবড়ে পড়েছে। দাম এতটাই কমেছে যে, কৃষকরা প্রতি কেজি মাত্র দু-তিন রুপিতে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন অবস্থায় ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে অনেকের ফসল।

মহারাষ্ট্রের নাসিক জেলার কৃষক কৃষ্ণ ডোংরে এবার সপরিবারে তার পেঁয়াজ চাষের জমিতে হোলিকা দহন ‘অনুষ্ঠান’ করেছিলেন। তার সেই ‘অনুষ্ঠান’-এর ছবিসহ খবর বেশ কিছু জাতীয় সংবাদপত্রে ছাপানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালও হয়েছিল সেই ছবি।

এ সপ্তাহের শুরুর দিকে ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রঙের উৎসব হোলি। তার আগের দিন গত ৬ মার্চ পালিত হয় ‘হোলিকা দহন’। বাংলায় একে ন্যাড়াপোড়া বলেন অনেকে, ইংরেজিতে বনফায়ার।

একজন কৃষকের পারিবারিক ‘অনুষ্ঠান’ জাতীয় সংবাদপত্রে উঠে আসার কারণ হচ্ছে, তিনি মূলত খড়কুটার বদলে ‘হোলিকা দহন’ করেছেন নিজের ক্ষেতের প্রায় ১৫ হাজার কেজি পেঁয়াজ পুড়িয়ে।

কেজি দুই রুপি
পেঁয়াজ চাষি ডোংরে বলেন, ১৫ দিন আগে আমি নিজের রক্ত দিয়ে লেখা একটা আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলাম মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনি যেন এসে আমদের সঙ্গে যোগ দেন ওই দিন।

‘অনুষ্ঠান’-এর সময়ে তোলা ডোংরে ও তার পরিবারের অশ্রুসজল চোখের ছবিও ঠাঁই পেয়েছে খবরের কাগজে। ওটা তো আসলে অনুষ্ঠান ছিল না, সেটি ছিল কয়েক মাসের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসল নিজের হাতেই নষ্ট করতে বাধ্য হওয়ার ব্যথা। ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া টাকায় চাষ করেও উপযুক্ত দামে পৌঁয়াজ বিক্রি করতে পারছেন না ডোংরে। সুদসহ ব্যাংকের দেনা কীভাবে শোধ দেবেন, সে চিন্তায় ঘুম হারাম তার।

ডোংরে বলেন, পেঁয়াজের দামের যা অবস্থা, তাতে হয়তো আত্মহত্যাই করতে হতো। সেটি করতে পারলাম না। তাই হাতে গড়া ফসলই শেষ করে দিলাম।

কৃষক নামদেব ঠাকরে বলেন, ছোট ছেলেটা ১০ রুপি দামের একটা আইসক্রিম খেতে চেয়েছিল, দিতে পারিনি। ১০ রুপির আইসক্রিম মানে তো পাঁচ কেজি পেঁয়াজের দাম!

এ বছর মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের ফলন এত বেশি হয়েছে যে, কৃষকরা প্রতি কেজি মাত্র দুই বা তিন রুপি দর পাচ্ছিলেন দু’দিন আগেও। তাতে চাষের খরচ তো উঠছেই না, উল্টো আড়তে পৌঁছে দিতে গেলে লোকসানের বোঝা আরও বাড়বে। তাই ক্ষেতেই পেঁয়াজ নষ্ট করে ফেলছেন কৃষকরা।

ডোংরে যেমন পুড়িয়ে ফেলেছেন ক্ষেতের পেঁয়াজ, তেমনি ট্র্যাক্টর চালিয়ে ফসল নিজেই নষ্ট করে দিয়েছেন নাসিকের নাইপালা গ্রামের কৃষক রাজেন্দ্র বোঢ়গুঢ়ে।

তিনি বলেন, তিন একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। পেঁয়াজ মণ্ডিতে আড়ৎদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার রুপির মতো খরচ হয় প্রতি একরের ফসলে। এক একরে ১৫০ কুইন্টাল ফসল তো হয়, ভালো ফলন হলে ১৭০-৮০ কুইন্টালও হয়। সেই হিসাব যদি করেন, তাহলে এক একরের ফসল থেকে গড়ে আমি দাম পাচ্ছি ৫০ থেকে ৬০ হাজার রুপি, যা আমার খরচের অর্ধেক। তাহলে সেই ফসল আড়তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও বাড়তি খরচ করে লোকসানের বোঝা বাড়াবো নাকি আমি?

কেন এই পরিস্থিতি?
ভারতে একসময় মহারাষ্ট্রই ছিল পেঁয়াজ চাষের মূল কেন্দ্র। কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ মধ্য প্রদেশ ও গুজরাটেও পেঁয়াজ চাষ শুরু হয়েছে। তার ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিরা।

মহারাষ্ট্রে নাসিক হচ্ছে সবচেয়ে বড় পেঁয়াজ বিপণন কেন্দ্র। সেখানকার পেঁয়াজের আড়তদার হীরামন পরদেশি।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, আগে শুধু মহারাষ্ট্র আর অন্ধ্র প্রদেশেই পেঁয়াজের মূল চাষ হতো। কিন্তু এখন মধ্য প্রদেশ ও গুজরাটের চাষিরাও ভালো পরিমাণে পেঁয়াজ চাষ করছেন। গুজরাটে তো পেঁয়াজ চাষিদের জন্য সেখানকার সরকার অনুদানও দিয়েছে। আর আমাদের পেঁয়াজের যে বাজার ছিল, সেটি গুজরাট, মধ্য প্রদেশ ধরে নিয়েছে অনেকটা। তাই এখানকার চাষিরা মার খাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে পর্যন্ত চাষিরা কুইন্টালপ্রতি (এক কুইন্টাল ১০০ কেজির সমান) ৩০০ বা ৪০০ রুপি দাম পেয়েছেন। হোলির পরে বৃহস্পতিবার থেকে আবার বাজার খোলার পরে দাম কিছুটা বেড়ে কুইন্টালপ্রতি প্রায় ৭০০ রুপি হয়েছে। কিন্তু তাতেও চাষিদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো যাবে না বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

পরদেশি বলেন, আমাদের পেঁয়াজ বেশি যেতো উত্তর ও পূর্ব ভারতে। কিন্তু গুজরাট ও মধ্য প্রদেশ থেকে উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পেঁয়াজ পরিবহনের খরচ অনেকটাই কম লাগে দূরত্বের কারণে। তাই আমাদের থেকে কম দামে ওখানকার চাষিরা পেঁয়াজ সরবরাহ করতে পারছে।

তিনি বলেন, দুবাই হয়ে পাকিস্তানে যেতো আমাদের পেঁয়াজ, শ্রীলঙ্কাতেও রপ্তানি হতো। কিন্তু ওই দুই দেশের যা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সেখানে আর পেঁয়াজ পাঠানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। আবার বাংলাদেশেও ভারতীয় পেঁয়াজের রপ্তানি কমে গেছে।

‘চাষের ক্ষেতে রক্তগঙ্গা’
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট দেবেন্দ্র শর্মা বলেন, এ বছর শুধু যে মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিরা ফসলের দাম না পাওয়ায় তা নষ্ট করে দিচ্ছেন তা নয়। প্রায় সব রাজ্যেই কৃষকরা ফসল নষ্ট করছেন দাম না পাওয়ার কারণে।

তিনি বলেন, পাঞ্জাব থেকে পশ্চিমবঙ্গ– এই বিরাট অঞ্চলের আলু চাষিদের অবস্থা দেখুন। তারাও দাম না পেয়ে রাস্তায় আলু ফেলে দিচ্ছেন।

কয়েকদিন আগে ছত্তিশগড় ও তেলেঙ্গানা ঘুরে এসেছেন এই কৃষি বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, সেখানে দেখলাম টমেটো চাষিরা ফসল নষ্ট করে ফেলছেন। মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিদের অবস্থা তো দেখছিই। আসলে সরকার থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারণকারী– সবাই বলে চলেছেন,

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com